করোনাকালীন সংকটে সংবাদপত্রের অবস্থা ও করনীয় | সাজ্জাদ হোসেন চিশতী
প্রকাশিতঃ ১১:৪১ অপরাহ্ণ | জুন ২৯, ২০২০

সাজ্জাদ হোসেন চিশতী:
বর্তমান বাংলাদেশ সহ প্রায় বিশ্বের সব দেশ এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে। গত বছর ২০১৯ সালে ডিসেম্বর মাসে চীনের ‘উহান’ শহর থেকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। করোনাভাইরাস বা কোভিড ১৯ নামে ভাইরাসটি,এর কারণে পুরো পৃথিবী এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। তারপরেও এই আতঙ্কের মধ্যেও যারা সম্মুখ যোদ্ধা হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তারা হলেন গণমাধ্যমকর্মী।
গত এপ্রিলের ৩ তারিখ প্রথম একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাপারসনের করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ ‘আমাদের গণমাধ্যম-আমাদের অধিকার’ সূত্রে জানা যায় এখন পর্যন্ত ১১০ দিনে পাঁচ শতাধিক সংবাদকর্মী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মারাও গেছেন দশজন। সে সঙ্গে করেনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও সাত জন।
গ্রুপটির কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ১২৮টি গণমাধ্যমের ৫০১ জন সংবাদকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়েছেন ১৪১ জন সংবাদকর্মী।
এরইমধ্যে গত ২৯ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মৃত্যু হয় সাংবাদিকদের প্রিয় মুখ, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় একজন ব্যক্তি সময়ের আলোর নগর সম্পাদক হুমায়ুন কবীর খোকনের । করোনায় মারা যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে আরও রয়েছেন প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, জবাবদিহির সহকারী সার্কুলেশন ম্যানেজার শেখ বারিউজ্জামান, এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের কক্সবাজার প্রতিনিধি আব্দুল মোনায়েম খান, বগুড়ার উত্তরকোন সম্পাদক মোজাম্মেল হক, ভোরের ডাক পত্রিকার চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি গোলাম মোস্তফা, যশোরের নওয়াপাড়া পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক বেলাল হোসেন, বগুড়ার সাপ্তাহিক হাতিয়ারের নির্বাহী সম্পাদক সাইদুজ্জামান।উপসর্গ নিয়ে মৃতদের মধ্যে রয়েছেন- সময়ের আলোর সিনিয়র সাব এডিটর মাহমুদুল হাকিম অপু, দৈনিক ভোরের কাগজের ক্রাইম রিপোর্টার আসলাম রহমান, বাংলাদেশের খবরের প্রধান আলোকচিত্রী মিজানুর রহমান খান, দৈনিক বগুড়া পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ওয়াসিউর রহমান রতন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সিনিয়র সাংবাদিক সুমন মাহমুদ, দৈনিক সমাচার ও চাঁদপুর জমিন পত্রিকার ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক আবুল হাসনাত।
দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করার জন্য নিজেদের জীবনবাজি রেখে কাজ করে তারা কি পেলেন? তাদের কে কতটুকু মর্যাদা দেয়া হলো? সেটা আসলে এখন আমাদের মনে জাগা একটি প্রশ্ন মাত্র।
মর্যাদা পাওয়াতো দূরের কথা প্রতিদিনই শুনতে পারছি মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না অনেক টেলিভিশন ও পত্রিকার মালিকরা।
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে জিটিভি,দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশসহ কিছু গণমাধ্যম কর্মীদের তাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অবাক হই দেশের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ও শীর্ষ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দৈনিক প্রথম আলো নাকি এবার করোনা পরিস্থিতির অজুহাতে এক তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য নাকি প্রথম আলোর বিভাগীয় প্রধানদের উদ্দেশ্য একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, দ্রুত ছাঁটাই যোগ্য কর্মীদের তালিকা দিতে। যেখানে সারা বাংলাদেশের বড় বড় পত্রিকা গুলো প্রথম আলোকে অনুকরণ করে সেখানে প্রথম আলোর এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত সংবাদকর্মীদের হুমকীর মুখে ফেলবে বলে আমি মনে করি। এমন সিদ্ধান্ত ভয়াবহ অমানবিক।
সংবাদপত্রের মতো একটি শিল্প আজ অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে যেটি সত্যিই অনেক কষ্ট দায়ক। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম গুলো আজ হারাতে শুরু করেছে তাদের ঐতিহ্য। অবশ্য এর আরও একটি কারণও আছে বলে আমি মনে করি। আমাদের দেশে এমন অনেক ব্যক্তি আছে যাদের একজনের আধা ডজন পত্রিকা! ভিতরের সবকিছু এক। পরিবর্তন শুধু মাস্টহেড বদল। ছাপা হয় ফকিরাপুল থেকে, কয়েকশ’ কপি। মজার ব্যপার হলো কনটেন্ট ও ডিজাইন একই এমন পত্রিকার সংখ্যা কয়েক ডজন। আবার দৈনিক ডিল মারি তোর টিনের চালে, দৈনিক দেখে নিবো, দৈনিক চাঁদনী রাতে বদনী হাতে, সাপ্তাহিক খালে পড়ে, হুংকার দেয় নামের এসব পত্রিকা গুলোরও অনেক দাপট। এরা প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিনের চেয়ে বেশি সার্কুলেশন দেখায় সরকারকে। বিজ্ঞাপণ পেলে কয়েক কপি পত্রিকা ছাপায়, ডিএফপির প্রত্যয়নপত্র নিয়ে রেখেছে,১৪০০০০/১৫০০০০ সাকুলেশন। ভর্তুকি দেখিয়ে কাগজ কেনেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের বাহিরে যান সম্পাদক। এসব পত্রিকায় বিজ্ঞাপণ দেয়ার জন্য তদবির ও চাপে নাস্তানাবুদ সবাই। এরা আবার বিজ্ঞাপণের জন্য দারে দারে ঘুরে বড় অংকের কমিশন দিয়ে রাখে। যার কারণে বিজ্ঞাপনদাতারা গণমাধ্যমের এই আগাছাগুলোর সুযোগ নেন। এর কারনে এখন মূলধারার গণমাধ্যমকে ২০-২৫% পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। ফলাফল মূলধারার সংবাদপত্রগুলো টিকে থাকার জন্য তাদের কর্মী ছাটাই কিংবা বেতন কর্তন করছে। এজন্যই মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো আজ হুমকীর মুখে। আর অনলাইন পোর্টালের কথা কি আর বলবো, বাংলাদেশে অনলাইন পোর্টাল কত এর সঠিক তথ্য বের করা কঠিন। তবে এপর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনের ফাইলে পাহাড়। এদের মূলধারার গণমাধ্যমে কোনো মান যুক্ত করেনা। তারপরেও সমাজে এসবের নেতিবাচক প্রভাব আছে প্রচুর। এসবের মালিক কারা?
এসব গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনাকে নানা ধরণের চাপ সামলাতে হবে, এমন ধারণা অনেকের। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে অনেকে। আগাছা গণমাধ্যমের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আড়ালে চলছে নানা অপকর্ম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথেও এদের খুব সখ্যতা।
এইসব ধান্দাবাজ পত্রিকা গুলো অচিরেই বন্ধ করতে হবে। এরজন্য আমাদের সাংবাদিকদের সংগঠন ও তথ্যমন্ত্রণালয় ও পিআইডিকে ভূমিকা পালন করতে হবে।
আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে আগাছার মত সাংবাদিকদের অনেক সংগঠন হয়ে গেছে। এদের নেতৃত্বে যারা আছে তারা বিভিন্ন ডট কম পট কমের সম্পাদক , সাংবাধিক পরিচয়ধারী। যারা জেলা উপজেলা কমিটি দিয়ে ধান্দাবাজী শুরু করে দিয়েছে। যার কারণে সাংবাদিকদের মর্যাদা বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদেরকে থামাতে হবে । আমাদের মূল সংগঠন যেগুলো আছে,বিএফইউজে, ডিইউজে , ডিআরইউ, ক্র্যাব,জাতীয় প্রেসক্লাব সহ প্রতিষ্ঠিত সংগঠন গুলোর নেতাদের কে এদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে এসব ভুয়া সাংবাদিক সংগঠন গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে এখন পর্যন্ত যেহেতু সরকার সংবাদপত্রের জন্য কোন রকম প্রনোদনা দিচ্ছে না সেহেতু আমাদের এই সংবাদপত্রকে বাঁচানোর জন্য তথ্যমন্ত্রনালয়ের ডিএফপি এর অধিনে সংবাদপত্রের যে টাকা আটকে আছে তা যেন অতিদ্রুত দিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, এলজিডি, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন জেলা উপজেলায় যেসব সরকারি বিজ্ঞাপণের যে সরকারি বিল গুলো বাকি রয়েছে সেগুলো যেন অতিদ্রুত দিয়ে দেওয়া হয়। তাহলে এই সংবাদপত্র নামক শিল্পটি কোন রকম বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
তাই পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আমাদের তথ্যমন্ত্রী ড.হাসান মাহমুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই আপনারা আমাদের অভিভাবক। আমাদের প্রনোদনার দরকার নেই আমাদের অনেক সাংবাদিক আজকে কর্মহীন, অনেক পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমত অবস্থায় সকল সরকারি বিজ্ঞাপণ বিল গুলো আমাদের প্রদান করার জন্য আপনারা নির্দেশনা দিবেন। নাহলে অচিরেই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এই শিল্পটি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে।তাই অনতিবিলম্বে সরকারি বিল পরিশোধ, ভূঁইফোড় সাংবাদিক সংগঠন,ভূয়া সাংবাদিক, আন্ডারগ্রাউন্ড দৈনিক এর বিরুদ্ধে ব্যাবস্হা নিন ও সংবাদ পত্র শিল্পটিকে বাঁচান।পাশাপাশি মালিকদের প্রতি, নোয়াবের প্রতি অনুরোধ আপনারাও আমাদের মানে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি সদয় হোন,কথায় কথায় বাদ দেওয়া,বিনাবেতনে ছুটি দেওয়া,বেতন কম দেওয়া বন্ধ করুন।
লেখক: সাংবাদিক, গণমাধ্যম শ্রমিক, কলামিস্ট, সাবেক ছাত্রনেতা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।